সেবামূলক পেশা এবং আমাদের পুলিশ

গত পুলিশ সপ্তাহ এ বীরত্বপূর্ণ, সততা ও ভাল কাজের জন্য অনেক পুলিশ সদস্যদের সম্মানিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের উপর আমাদেরও সম্মান রয়েছে। তারপরও হয়ত এখানে এমন কিছু কথা বলা হয়ে যেতে পারে যা তাঁদের পক্ষে যাবে না। এর মানে এই নয় যে, আমরা একটি সরকারি বাহিনীকে সম্মান দেখাচ্ছি না। যা বলব একজন সাধারণ মানুষের ভাবনা থেকেই বলার চেষ্টা করব। read more

লেখা আহবান – ‘প্রজন্ম’ ৬ষ্ঠ সংখ্যা

সম্মানিত সদস্যগণ, আস্‌সালামু আলাইকুম এবং শুভ অপরাহ্ন। আশা করছি সবাই ভাল আছেন।

১। ধারাবাহিকতা অনুযায়ী ‘কিছু বলতে চাই’ এর চতুর্মাসিক ই–ম্যাগাজিন “প্রজম্ম” ৬ষ্ঠ সংখ্যা (এপ্রিল ২০১৯) প্রকাশের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। সে লক্ষ্যে নিম্নবর্ণিত বিভাগে আপনাদের লেখা আহবান করা যাচ্ছেঃ read more

কিরকম মানুষ হয়ে গেলাম!

শৈশবের সাদা বক উড়ে গেছে
সকল নির্মলতা আর পবিত্রতা নিয়ে,
কোন বিপন্ন প্রজাতির মতো বহু কষ্টে
কোথাও কোথাও সংরক্ষিত রয়েছে লজ্জা,
দুপুরের সোনালী চিলেরা বড় নিষ্ঠুর
ঠুকরে ঠুকরে খেয়ে নিয়েছে সকল বোধ!

তাই বুঝি আমার আজ লাজহীন, বোধহীন
কিংবা অপবিত্র হতে কোন বাঁধা নেই। read more

দূর্নীতি, উন্নয়ন; ব্যক্তিকেন্দ্রিক তৎপরতা

আমাদের দেশে উন্নয়ন এবং দূর্নীতি একই সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলে আসছে। হাল আমলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উন্নয়নের মাত্রা অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছে (যেভাবেই হোক এটা আজ প্রমাণিত)। কিন্তু দূর্নীতিকে কি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে? কিছু কিছু ক্ষেত্রে দূর্নীতি না করলেই বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে– হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। যাদের সরকারি অফিসের সাথে কারবার আছে তারা দূর্নীতির এই বিষয়টার সাথে বেশ ওয়াকিবহাল আছেন। যে দূর্নীতি করে এবং যে দূর্নীতির শিকার দু’পক্ষের কাছেই বিষয়টা একদম স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। অনিয়মগুলোই প্রতিষ্ঠিত হয়ে রয়েছে নিয়ম হিসেবেই। read more

টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা নিয়ে লাখো মানুষের খেদোক্তি

কিছু ক্রন্দনসিক্ত আকুতি আর লাখো মানুষের খেদোক্তি  

————————

টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মুহূর্তের অডিও ক্লিপ নিয়ে তোলপাড় চলছে সারাদেশে। একরামের কন্যার সেই ক্রন্দনসিক্ত প্রশ্নগুলো গা শিউরে দিচ্ছে ১৬ কোটি বাঙালীর। শক্ত মন গলে যাচ্ছে আবেগে, ক্ষোভে, প্রতিবাদে। read more

যার যত বেশি ক্রয়ক্ষমতা আছে সে তত বেশি সুখি?

যার যত বেশি ক্রয়ক্ষমতা আছে সে তত বেশি সুখি? ব্যাপারটা অনেকের কাছে যেমন হাস্যকর তেমনি আবার অনেকের কাছে ভালই যুক্তিসঙ্গত। যারা এটার বিপক্ষে তারা হয় গরীব, নতুবা কৃপণ! এরকমটাই ভাবছেন কেউ কেউ, তাই না? আপনারা আমাকে যাই মনে করুন না কেন, আমি কিন্তু এটার ঘোর বিরোধী। আমি এখনো একমত হতে পারিনি যে, বেশি পরিমাণ ক্রয়ক্ষমতা কারো জীবনকে সুখী করে দিতে পারে।

হঠাৎ করে এ বিষয় নিয়ে কথা বলবার কারণ হলো, আমাদের মধ্যে অনেকেই ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বেশ উৎসাহী। মনে সংকল্প রাখে, যেভাবেই হোক আমাকে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। একধরণের প্রতিযোগিতা বিরাজ করে আমাদের মাঝে- কিভাবে প্রতিবেশীর তুলনায় বেশি আয় এবং ব্যয় করার ক্ষমতা সংরক্ষণ রাখা যায়। আমরা জানি, প্রতিটি মানুষের মধ্যে একটি শিশুসুলভ পবিত্র সত্তা বাস করে। একটি নির্দিষ্ট সময় পার হবার পর ধীরে ধীরে আমাদের সেই পবিত্র সত্তাটি বিলিন হতে থাকে পরিবেশ পরিস্থিতির দাবী পুরণ করতে গিয়ে। যেখানে একটি শিশু ধীরে ধীরে মানুষ হয়ে উঠবার কথা ছিল সে কিনা ধীরে ধীরে হয়ে উঠে অন্য জীব। অনেকেরই আর শেষ অবধি মানুষ হয়ে ওঠা হয় না।

আমি বলছি না যে- অমানুষ হবার পিছনে অর্থই একমাত্র কারণ। কিন্তু এটাও অস্বীকার করতে পারছি না “অর্থই অনর্থের মূল”। কেউ টাকা দিয়ে মসজিদ মন্দির বানায় আবার কেউ টাকা দিয়ে রক্ত ঝরায়। কেউ টাকার বিনিময়ে মানুষ বাঁচায় আর কেউ টাকার বিনিময়ে খুন করে। এই টাকা বা অর্থের জন্যই মানুষ তার হাজার বছরের অহংকার মানবিক নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে দেয়। একজন বৈধ চাকুরিজীবি অবৈধ ঘুষখোরে পরিণত হয়, ব্যবসায়িক অনৈতিকতার সিঁড়ি টপকাতে থাকে একটার পর একটা কেবল এই অর্থের লোলুপতার মোহে।

ক্রয়ক্ষমতার সাথে সুখের সম্পর্ক রয়েছে- এমনটি যারা মনে করেন তাদের এই ধারণার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি আপনি হয়ত ভুল করছেন। বেশি বেশি আয় করবেন আর ইচ্ছে মতো ক্রয় করবেন এটাকে আমি সুখ বলতে পারছি না। এটা আমার কাছে বিলাসিতার সমতুল্য। বেশি বেশি আয় করবেন আর বেশি বেশি মানুষকে সহায়তা করবেন এটার সাথে মানবতার সম্পর্ক থাকলেও নিজের ইচ্ছের পিছনে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় আদতে বিলাসিতাই বটে। আমরা সবাই আয় করি জীবিকার জন্য। কিন্তু একটা সময় এটা জীবিকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না, প্রতিযোগিতায় রূপান্তর হয়। আর এটা একটা অশুভ প্রতিযোগিতা। আপনারাও স্বীকার করবেন অশুভ প্রতিযোগিতার এই আয় দিয়ে কেউ নিত্য সামগ্রী কিনে না- কিনে বিলাসবহুল পন্য। যার মুনাফা চলে যায় আরেকজন উচ্চবিলাসী বিত্তবানের পকেটে। যে শ্রমিক বা প্রান্তিক উৎপাদক পন্যটি তৈরি করে সে কখনো পায় না তার ন্যায্য পাওনা। আমরা যারা মধ্যবিত্ত আছি তারা সে বিষয়টা কখনো বুঝতে পারলাম না৷ নিজেদের উচ্চবিত্তের আদল দেবার জন্য বার বার নিজেকে অসৎ করে নেবার চেষ্টা করি হয়ত নিজেরি অজান্তেই। মনে করতে থাকি টাকার ভেতরে না জানি কত সুখ কত আনন্দ। কিন্তু কেউ কি প্রমাণ পেয়েছেন টাকায় সুখ আছে কতটা?

আসলে সুখ টাকায় নয়। সুখ হলো আপনার মানসিকতায়। যে মন যাকে নিয়ে তৃপ্ত। বিপত্তি এখানেই। তাই কষায়ও (রূপক অর্থে) যেমন দেখা তেমনি সেবকও দেখা যায়। অর্থ সবার জীবনেই দরকার কিন্তু সেটা যেন আপনাকে অমানুষ করে দিতে না পারে। আমি জানি আর্থিক নিরাপত্তা না থাকলে জীবনটা তালপাতার বাসি হয়ে যায়। যেখানে কোনদিনই শানাইয়ের সুর বাজে না, বাজে কেবল তালহীন বেতালে সুর। কিন্তু কোন এক মাহেন্দ্রক্ষণে সেই বেতাল সুরও মনে প্রেম জাগিয়ে তুলতে পারে৷ যারা সুখ সুখ বলে চিৎকার করে তারা আসলে সুখকে চিনে না। আর চিনে না বলেই সারা জীবন সুখ তার কাছে অধরাই থেকে যায়। একটা সময় সে ঠিকই অনেক অর্থের মালিক হয়, এখন সে যা খুশি কিনতে পারে। কি সুখ?

নীড় ছোট ক্ষতি নেই- এই কনসেপ্টটা সম্পর্কে আমরা অনেকেই পরিচিত আছি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানটিও অনেকেই শুনেছেন। কোটি কোটি মানুষ জীবনযুদ্ধে হেরে গিয়েও জিতে গেছে মনের যুদ্ধে। নিজের জীবনকে ভালবাসতে না পারলে তাকে উপভোগ করা যায় না। আর জীবনকে উপভোগ করতে হলে দরকার প্রাণশক্তি। নিজেকে অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে ভরপুর করতে না পারলে সুখ কখনো স্থায়ী হয় না। অন্যদিকে আমরা সুখ খুঁজি পন্যে। ভাল থাকার আশায়, একটুখানি সুখ পাবার আশায় আমরা কতকিছুই না করি! এমনকি অমানুষ হতেও দ্বিধা করিনা।

আমরা জানি, দুনিয়াতে সবকিছু আপনার পক্ষে যাবে না। এই মহাবিশ্বে আমি-আপনি যে কত ক্ষুদ্র অস্তিত্ব সেটা কি কখনো ভেবেছেন? আপনার আর আমার কথা বাদ দিন। এই গ্রহে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? সমুদ্রের পানি কয়েক ফিট বেড়ে গেলেই পুরো দেশই খুঁজে পাওয়া যাবে না। বা নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ বলের একটু হেরফের হলেই পুরো সৌরজগত এলোমেলো হয়ে যাবে। আমাদের নিহারিকার ছোট্ট এক সদস্য এই সৌরজগত। কখনো কি ভেবেছেন আপনার গ্রহটি এই নিহারিকাপুঞ্জের তুলনায় কত তুচ্ছ আর নগন্য? সেখানে আপনার আমার প্রতিযোগিতা খুবই হাস্যকর। বিশ্বাস না হলে এ ব্যাপারে কয়েকটা ঘন্টা স্টাডি করে নিতে পারেন। দেখবেন আপনি কোথায় আর আপনার টাকা কোথায়। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে আপনি বেঁচে আছেন মাত্র ৫% সম্ভাবনা নিয়ে। বাকি ৯৫% সম্ভাবনা থাকছে আপনার হার্ট যেকোন সময় এ্যাটাক হতে পারে। এটা বিজ্ঞানের কথা। আবার যারা পরকালে বিশ্বাস করেন তাদের কাছে তো ইহজাগতিকতা একটা নগন্য সময়কাল মাত্র। পুনর্জীবন বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রেও ইহজগত একটি পরীক্ষা ক্ষেত্রের মতো। আপনার সংকল্প জুড়ে যা আছে তা কি আপনার বিশ্বাসের সাথে যায়?

ধর্মের কর্মেই শান্তি! এধরণের কনসেপ্ট নিয়ে সবাই কথা বলি, তাই না? সবাই জানি বিশ্বাস মোতাবেক আমরা কেউ কাজ করি না। রসগোল্লা সামনে আসলেই কেন জানি সমস্ত বিশ্বাস ভুলে আমরা একেকজন পিপীলিকা হয়ে ওঠি। ভুলে যাই সকল পবিত্রতা আর সুন্দরের কথা। আমাদের সবার যেন জন্ম হয়েছে সুযোগ পেলেই হাতছাড়া না করার জন্য। আমরা পবিত্র ও সুন্দর কেবল লেবাসে, কর্মে ও আচরণে নয়। মন চাইলেই আমরা ধর্ষণ করি, সুযোগ পেলেই আমরা ঘুষ খাই, স্বার্থ দেখলেই আমরা খুন করি, উপরে উঠার চান্স পেলেই নিচে যারা আছে তাদের পায়ে মাড়াই। সবাই এক অশুভ ও অদৃশ্য প্রতিযোগিতার অনন্য প্রতিযোগী। এই তো আমরা, তাই না?

সব কথার মুল কথা হলো- আমার মধ্যে তৃপ্তিবোধ জাগাতে হবে। নিজের কাজে, নিজের যোগ্যতায়, নিজের অর্জনে বিশ্বাস করা মানেই নিজের জীবনকে ভালবাসার মতো কাছাকাছি মানসিকতায় পৌঁছে যাওয়া। তাহলেই আমি সুখী ভাবতে পারব নিজেকে নিয়ে। আর নিজেকে নিয়ে তথা নিজের সবকিছু নিয়ে যে সুখী নয়, তাকে বাহ্যিক কেউ বা বাহ্যিক কিছু সুখী করতে পারে না। এবং সে অন্যকেও সুখী করতে পারে না। পাশের বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়িকে সুভাসিত করে বলেই আমার যা কিছু তা বরাবরই অবহেলিত। নিজের সুখের জন্য নিজের উপরই বিশ্বাস রাখুন৷ নিজের উপরই বেশি বেশি সন্তুষ্ট থাকুন। তাহলেই বুঝতে পারবেন সুখ আসলেই কি জিনিস!

আমাদের দেশে উন্নয়ন এবং দূর্নীতি একই সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলে আসছে। হাল আমলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উন্নয়নের মাত্রা অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যেভাবেই হোক এটা আজ প্রমাণিত। কিন্তু দূর্নীতিকে কি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে? কিছু কিছু ক্ষেত্রে দূর্নীতি না করলেই বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে– হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। যাদের সরকারি অফিসের সাথে কারবার আছে তারা দূর্নীতির এই বিষয়টার সাথে বেশ ওয়াকিবহাল আছেন। যে দূর্নীতি করে এবং যে দূর্নীতির শিকার দু’পক্ষের কাছেই বিষয়টা একদম স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। অনিয়মগুলোই প্রতিষ্ঠিত হয়ে রয়েছে নিয়ম হিসেবেই।

এখন প্রশ্ন হলো দূর্নীতি এবং উন্নয়ন কি একসাথে চলতে পারে? এর উত্তর হ্যাঁও হতে পারে আবার নাও হতে পারে। কিন্তু উচিত অনুচিতের প্রশ্নে– দূর্নীতি আর উন্নয়ন একসাথে চলা উচিত নয়। তাহলে কি আলাদা আলাদাভাবে চলা উচিত? যেমনঃ শুধু দূর্নীতি হবে উন্নয়ন নয় অথবা শুধু উন্নয়ন হবে দূর্নীতি নয়। এর মধ্যে সবার কাছে শেষের কথাটি তথা দূর্নীতিহীন উন্নয়নই কাম্য। আসলে বাংলাদেশে কখনোই দূর্নীতিহীন উন্নয়ন হয়নি। প্রায় প্রতিটি উন্নয়নের পেছনে কিছু অনিয়ম, অসততা, অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি একদম স্বাভাবিকভাবে জড়িয়ে রয়েছে। দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খাত রয়েছে যেখানে আদৌ উন্নয়নের আলো পৌঁছেনি। বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে মানে বেশি সংখ্যক মানুষ ভাল আছে তা নয়। উন্নয়নের সুবিধাগুলো প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে সেভাবে এখনো পৌঁছাতে পারেনি। বড় অর্থনীতির দিকে হাঁটার সাথে সাথে ব্যক্তি ধনীর সংখ্যাও বাড়ছে। বৈষম্য অনেকখানে বেড়ে গিয়েছে আগের চেয়ে।

যারা দূর্নীতি প্রতিরোধ করবার জন্য নিয়োজিত তাদের কাজগুলোতে খুব বেশি জবাবদিহিতা আছে বলে মনে হয়নি। এমনকি তারা একাজে সফল এটাও প্রমাণ করতে পারেনি। প্রায় সময় দেখা গিয়েছে প্রভাবশালীদেরকে আড়াল করা হয়েছে। নির্দিষ্ট মহলের প্রস্তাব অনুযায়ীই তারা কাজ করে বলে সমালোচনা রয়েছে। ফলে অনেক অপরাধী আইনের আওতা থেকে সরে থাকবার সুযোগ পেয়ে যায়। যার জন্য বাংলাদেশের এধরণের কোন ডিপার্টমেন্ট বা কমিশন বা প্রতিষ্ঠানকে সাধারণ মানুষ বিশ্বাসই করতে পারে না। কমিশন বা এধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো কোন পদক্ষেপ নিতে গেলেই সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করে যে– এটা কারো না কারো ইশারাই বা স্বার্থ রক্ষার জন্য করা হচ্ছে। এখান থেকেই বুঝা যায় আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর মানুষের আস্তা কতটুকু। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এই আস্তাহীনতার কথা প্রতিষ্ঠানগুলোও যেমন জানে তেমনি রাগ-বোয়ালেরাও জানে। ফলে দূর্নীতি রোধমূলক সামগ্রীক পরিস্থিতে কোন উন্নতি হয়নি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতাকে আড়াল করার জন্য এবং দৈনন্দিন কাজকে চলমান রাখার জন্য তারা আদা-জল খেয়ে নেমে পড়ে কোন ছোটখাট বা সরকারের বিরাগভাজন দূর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে। অথচ তাদের আইনগুলো দেশের ছোট-বড়, ধনী-গরীব, ক্ষমতাহীন-প্রভাবশালী সবার উপরই সমানভাবে প্রয়োগ হবার কথা ছিল।

আমাদের দেশে দূর্নীতিটা অনেকটা ব্যক্তি পর্যায়ে। তাই এটাকে রাতারাতি ঠিক করা সম্ভব নয়। আশার কথা হলো– মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইদানিং বেশ শক্তভাবেই দূর্নীতির বিপক্ষে কথা বলছেন। তাঁর এ অবস্থানটা অনেক সৎ মানুষকে আশাবাদী করেছে। কারণ তাঁর সক্ষমতা সম্পর্কে অনেকেই জানেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর কৌশলগুলো বেশ সফল বলা যায়। তাই অনেকের বিশ্বাস, তিনি এবার দূর্নীতি বন্ধ করে ছাড়বেন। আমরা যদি ধরেই নিই– প্রধানমন্ত্রীর অন্য সফল কাজগুলোর মতো দূর্নীতির বিরুদ্ধেও যদি শক্ত অবস্থান নেন, তাহলে কি দূর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব? আমার মনে হয় বিষয়টা এত সহজ নয়। কারণ, এখানে বেশিরভাগ দূর্নীতির সাথে ব্যক্তি জড়িত।

চরম ভোগবাদী মানসিকতা প্রায় সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে জাগ্রত থাকায় তারা দূর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়ে। তারা কোনভাবেই ধারণ করতে পারে না যে– এটা একটা অপরাধ, অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ের কাজ। না খেতে পেয়ে দূর্নীতি করছে এমন লোকের সংখ্যা আর কত! সবাই দূর্নীতি করছে নিজেদের ভোগবিলাসের তাগিদে এবং তা একান্ত ব্যক্তিগত পর্যায়ে। তাহলে একজন প্রধানমন্ত্রী কিভাবে এটা বন্ধ করবে? তিনি যাদেরকে দিয়ে দূর্নীতিকে রোধ করবার পদক্ষেপ নেবেন তাদেরই বা সততা কতটুকু? তারা ইতোমধ্যে ভূরিভুরি অসততা আর নিমর্মতার নজির সৃষ্টি করে বসে আছে। বসে বসে চেয়ে দেখা ছাড়া আমরা সাধারণ মানুষেরা এসবের বিরুদ্ধে তেমন কিছুই করতে পারি না। আমরা শুধু নিজেকে শুধরাতে পারি।

যতই উন্নয়ন হোক না কেন প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত তার যথাযথ সুফল পৌঁছোবে না যতক্ষণ না দূর্নীতিকে লাগাম টানা যাবে। ব্যক্তিগতভাবে সবাইকে বুঝতে হবে আমিই কেবল পারি দূর্নীতিকে বন্ধ করতে। আমি যদি আমার কাজটা অসততামুক্ত, অনিয়মমুক্ত করতে পারি তাহলে আমি একা আমার পোষ্টে/পদে যতদিন থাকব ততদিন আমার সব কাজই দূর্নীতিমুক্ত থাকবে। একজন মানুষ তার চাকুরী জীবনে, পেশাগত জীবনে বিশ লেকে চল্লিশ বছর অবধি কাজ করতে পারে। ভেবে দেখুন আপনি এক জীবনে কত কাজ করে থাকেন। নিজের বিবেককে প্রশ্ন করুন– আমি কি আমার সকল কাজকে দূর্নীতিমুক্তভাবে করতে পেরেছি?

জাতি হিসেবে আমাদের বড় দুর্বলতা হলো– আমরা দূর্নীতিমুক্ত হতে পারছি না। প্রতিবছর আমাদেরকে একটি দূর্নীতিগ্রস্ত দেশের মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। হয়ত আমি নিজে বা আমারই কোন সন্তান বা আমারই বাবার কুকর্মের দায় পুরো জাতিকে ভাগ করে নিতে হচ্ছে। তাহলে কেন আমি আমার বাবাকে থামাচ্ছি না? কেন আমার সন্তানের কাজ সম্পর্কে আমি জানছি না? ব্যক্তি হিসেবে আমার–আপনার কি কিছুই করার নেই? একটি হালাল, সৎ জীবন যাপনের জন্য আমি কি কিছুই করতে পারি না? নাকি আমি কোনদিনই এটা চেষ্টা করিনি?

ভোগবাদী মানসিকতা দূর্নীতি নামক যে অপসংস্কৃতি আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসততার বীজ বুনে রেখেছে সেটাকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের গ্রুপে সদস্য সংখ্যা অনেক। একজনের খবর অন্যজন না জানলেও নিজের খবর নিজে খুব ভালভাবেই জানি। আমরা কে কতটুকু মানুষ সেটা সে নিশ্চিভাবে জানে। নিজের কাজটা নিয়ে ভাবুন, নিজের করণীয় ঠিক করুন। সৎ জীবনও সুন্দর হতে পারে এটাকে বিশ্বাস করতে শিখুন। আরেকজন ঠিক হচ্ছে না বলে আমি ঠিক হতে পারছি না এমনটা ভাবা চলবে না। সবার আগে আমাকে অর্থাৎ আপনাকেই শুরু করতে হবে। নিজে শুদ্ধ না হয়ে একটা দূর্নীতিমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখা একধরণের হটকারিতা। আমাকে বলতে পারতেই হবে– আমি ঠিক হয়ে গেছি। আমি ফেসবুক স্ট্যাটাসে যেসব নীতিবাক্য বলি সেটা আমার মধ্যে এবং আমার পরিবারে লালিত পালিত হওয়া উচিত। তা না হলে– আপনার স্বপ্নের সাথেই আপনি নিজে প্রতারণা করছেন।

আজকের বাংলাদেশ

বাংলাদেশ; প্রতিদিনই কোন না কোন ঘটনা বা দুর্ঘটনা, প্রাসঙ্গিক বা অপ্রাসঙ্গিক, উন্নত বা হীন, সুন্দর বা কুৎসিত ইত্যাদি কত কিছুরই না জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে কখনো আমরা চরমভাবে হতাশ হয়ে পড়ছি আবার কখনো পরম আশাবাদী হয়ে উঠছি। কখনো মর্মবেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি আবার কখনো অবাধ উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছি। এর সবকিছুই কিন্তু একান্ত ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আপন পরিবার সংক্রান্ত হেতু নয়। এর অনেকটাই জুড়ে আছে দেশের কোন প্রান্তে ঘটে যাওয়া কিছু অনিয়ম, কিছু অব্যবস্থাপনা কিংবা কিছু প্রেরণা। তবে এটা সত্য যে, নেতিবাচক উপাখ্যানের পাল্লাটা আজ বড় বেশি ভারী হয়ে আছে। আপনাদের মাঝে অনেকেই আমার সাথে একমত হবেন যে- “কতদিন হয়ে গেল আমাদের দেশে আশা জাগানিয়া কোন অর্জন নেই!”

আমরা জানি না কাল নতুন ভোরে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে! আমরা জানি না আগামী কালকের জীবনটায় আমাদের জন্য ঠিক কি অপেক্ষা করছে। আজ যদি সব কিছু ঠিকঠাকভাবে চলত তাহলে আগামীকাল সম্পর্কে আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট অনুমান থাকতো- আমরা ঠিক কী মোকাবেলা করতে যাচ্ছি। আমরা যেখানে একদম নিকট ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে পারছিনা সেখানে আপনার/আমার সন্তান আগামীর বাংলাদেশে কিভাবে বাস করবে সেটা তো একেবারেই অনিশ্চিত। তাই না?

এটা কেন? বাংলাদেশ প্রতিদিনই অস্থিতিশীল থেকে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠছে। স্থিতিশীল একটি দেশের সাথে আমাদের দেশের ব্যবধান যেন প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা আজ অনেকেই খুঁজে পাচ্ছিনা, এই দেশটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবার কোন প্রয়াস। প্রচন্ড রকম একটা অভিমান, আক্ষেপ আমাদের গলায় আটকে থাকছে। ভেবে দু’চোখে অন্ধকার দেখি- আমার প্রিয় মাতৃভূমি কোন দিকে যাচ্ছে? আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে আমাদের অনিবার্য কিছু নান্দনিক অর্জনের জন্য? যা আমাদেরকে একটি সোনার বাংলায় নিয়ে যেতে পারে।

সরকারি দলের দায়িত্বশীলরা একসময় বলতো, “বিরোধী দল দেশটা অস্থিতিশীল করে তুলেছে, যা উন্নয়নের ধারাকে পিছিয়ে দিচ্ছে”। একসময় হরতালের কারণে দেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণের ক্ষতি হতো। এটা দেখে আমারো বিশ্বাস হতো, হ্যাঁ এ ক্ষতি অন্ততঃ থামা উচিত। যেভাবেই হোক আজ আমাদের দেশে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কোন বিপক্ষদল নেই। যারা আছে তারা হয় মেরুদণ্ডহীন, নয় তো তারা গৃহপালিত। বলতে গেলে সরকারের কাজে বাঁধা দিতে পারে এমন কেউ আজ অবশিষ্ট নেই। তাহলে কেন আমরা এখনো আটকে রয়েছি? কেন আমাদের দেশ প্রতিদিনই অব্যবস্থাপনায় ভরে উঠছে? কেন আমাদের অস্থিতিশীলতা কাটছে না? হয়ত এর উত্তরগুলো আমরা সকলেই জানি, কিন্তু প্রতিরোধের সমস্ত পথ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে।

উপরে বলেছিলাম আমাদের আগামী কালকের জীবনটাই অনিশ্চিত। আমরা কেউই জানিনা, আমাদের দেশ কোন দিকে যাচ্ছে। ওদিকে আপনি খোঁজ করলে দেখতে পাবেন অন্যদেশগুলো কতটা জনবান্ধব হয়ে উঠছে। সুইজারল্যান্ডের কথা যদি বলি, তাহলে দেখব তারা কতটা ভাবে তাদের নাগরিক নিয়ে। সেখানে আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর তারা ভাবছে কিভাবে দেশ বা জনগণকে বড় ধরণের বৈশ্বিক বিপর্যয় থেকে সুরক্ষিত রাখা যায়। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিংবা নিউক্লিয়ার আক্রমণ থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করার জন্য নাকি তারা প্রস্তুত রয়েছে। সম্ভাব্য বেশ কিছু নিরাপত্তা প্রকল্প তারা বাস্তবায়ন করে রেখেছে। একটু অবাকই হতে হয় যখন তাদের রাজনীতি আর আমাদের রাজনীতি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে তুলনা করি। কেন আমাদের রাজনীতি আর রাষ্ট্রতন্ত্রের অনিয়ম প্রতিদিনই লাগামছাড়া হয়ে উঠছে? কেন এদেশের মানুষের নিয়তি এতটা অভিশপ্ত হয়ে গেল? কি অপরাধ ছিল এদেশের মানুষের? শুধু আমরা এদেশে জন্মেছি বলে?

জানেন কি, পৃথিবীতে অনেক কারাগার রয়েছে যেখানে আমাদের দেশের সাধারণ জনগণের অধিকার বা সুবিধা ভোগের চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি সুবিধা আর অধিকার ভোগ করে সেখানের কয়েদিরা? তাহলে স্বাধীনতার পর ৪৭ বছর ধরে আপনারা কিভাবে দেশ পরিচালনা করেছেন যে, কোন কারাগারের কয়েদীদের চেয়ে বেশি কিংবা তার সমতুল্য অধিকার বা সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলেন না জনগণের জন্য? দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, প্রতিহিংসা, রাজনীতিতে জবাবদিহিতার অভাব এরকম আরো অনেক উপসর্গ দেশটাকে গ্রাস করে ফেলেছে। অনেকেই বলে থাকেন এজন্য নাকি আমাদের জনগণের সচেতনতা সংক্রান্ত কিছু দোষ আছে। হ্যাঁ, মানছি যে জনগণের এখানে কিছু সমস্যা রয়েছে। কিন্তু এটাও আপনাকে মানতে হবে যে, এদেশে বড়রকম কোন পদক্ষেপের জন্য জনগণ কখনোই বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। হাল আমলের কিছু ঘটনা থেকে এটা বুঝা যায়। এদেশের জনগণের পূর্ণ সমর্থন থাকা সত্বেও নিরাপদ সড়কের আন্দোলন সফলতা পায়নি। শুধুমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিরা চায়নি বলে। অবশেষে আন্দোলনের পরেও মায়ের বুক খালি হওয়া ছাড়া কিছুই পায়নি আমরা তথা নিহতের পরিবার। ভেবেছিলাম শিশুদের দেখানো কাজের জন্য সরকার বা প্রশাসন কিছুটা লজ্জিত হবে। না। তার কিছুই হয়নি। যেখানে ছিলাম সেখানেই আমরা দাঁড়িয়ে আছি।

তাহলে সরকার প্রমাণ করতে পেরে গেছে যে, “জনগণ এদেশে কিছুই করতে পারে না”। মানুষ যথাযথভাবে ভোট দিতে পারে না এদেশে অনেকদিন হয়ে গেল। সামনে কতদিনে তা পারবে আমরা জানি না। ভোট দিতে পারলেও বা কি? ভোট দিয়ে যাকে ক্ষমতায় আনব সেও এসরকারের হয়ত উল্টোপিট। কেবল নামে তফাত, কাজে নয়। এটা আমরা প্রমাণ পেয়ে গেছি বিগত সময়ের সরকারগুলোর কাজ থেকে। কি করতে পেরেছে জনগণ? তাহলে কেন সবকিছুর জন্য আপনারা এদেশের জনগণকে দায়ী করবেন? এদেশের জনগোষ্ঠীর মতো অসহায় আর কোন জনগোষ্ঠী কি আছে? হয়ত আছে। কিন্তু আমরা তো তাদের মতো হতে চাইনি!

কেন জানি আমার মনে হয়, শুভ রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে আমরা এগিয়ে যেতে পারতাম যদি, তাহলে বাংলাদেশ ওভারকাম করতে পারতো। কেননা এদেশের রাজনীতিবিধরা অসীম ক্ষমতার মালিক। তাদের সামনে বর্তমানে বিরাজমান সমস্যাগুলো কিছুই না। এটা আমার বিশ্বাসে চলে এসেছে। শুধু রাজনীতি সৎ হলে দেশের সব সেক্টরে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, এটা আজ খুব ভালভাবে অনুমেয়। কিন্তু এদেশের রাজনীতিতে কোন ভাল মানুষ বা নীতিবান কেউ আছে বলে কেউ মানতে পারবে না। কোন মেধাবী ও সৎ মানুষ রাজনীতি করে না এদেশে। ছাত্র রাজনীতিতে সবচেয়ে উশৃংখল ক্যাডার বা ছাত্র নেতারা দেশের মুল রাজনীতিতে বহাল হতে দেখা যায়। অথবা কোন সফল ব্যবসায়ী। এরা বরাবরই নিজের স্বার্থকে যত্ন করে এসেছে এবং জনগণের অধিকারকে উপেক্ষা করেছে। বলতে পারেন- পুলিশের অনিয়মের লাগাম কে টানবে? শুধু পুলিশ কেন, সরকারি কোন অধিদপ্তরই অনিয়মের বাইরে নয় যারা মাত্রা ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। বোধয় আবহাওয়া অধিদপ্তর আর ইসলামী ফাউন্ডেশন ছাড়া সবাই দূর্নীতিকে আপন করে নিয়েছে। এদের লাগাম টানার ক্ষমতা কি জনগণের আছে? নেই। রাজনীতির এত বিশাল ক্ষমতা কি কোনদিনই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে না? এ ক্ষমতা কি শুধু জনগণের বিরুদ্ধেই ব্যবহার হবে? ভাববার বিষয় বটে।

হতাশ হবার মতো যথেষ্ট কারণ থাকা সত্বেও এদেশের মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজ করে যাচ্ছে একরাশ অভিমান আর ক্ষোভ বুকে নিয়ে। এজনমে আর কোনদিন আমাদের ভাগ্য উন্নত হবে না জেনেও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে কালকের দিনের জন্য আমরা অপেক্ষা করি। সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি রাতে। আরো প্রাণ অকালে ঝরে যাবার সংবাদ শুনে আমরা আবারও মৌলিক প্রয়োজনীয়তার সন্ধানে নেমে পড়ি ভোরে। কোন কথা বলা যাবে না জেনেও মাঝে মাঝে গর্জে ওঠি অধিকার আদায়ের স্লোগান মুখে নিয়ে। আমাদের যারা রক্ষা করবে তাদের গুলিতেই আমরা লুটিয়ে পড়ি রাজপথে। ঘর থেকে বের হওয়া কত ‘আমি’ আর ঘরে ফিরতে পারিনি- ঘরে ফিরে যায় কেবল ‘আমারই’ রক্তভেজা শার্ট।

হ্যাঁ, এটাই আজকের বাংলাদেশ নয়কি?

সড়ক দুর্ঘটনা এবং আমাদের মূল্যহীন জীবন

এমনিতেই এদেশে মানুষের জীবনের মূল্য খুবই কম। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য তো একেবারে নেই বললেই চলে। যদি মূল্যই থাকতো তাহলে গত ২৯ জুলাই এ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু সংবাদ শুনে কোন মন্ত্রী হাসবেন কেন? মন্ত্রী মহোদয় যেভাবে হাসলেন তাতে মনে হয়েছে সাংবাদিকরা বুঝি তাঁকে কোন মজার কৌতুক শুনিয়েছেন। দেশের জনগণের কি মনে হয়েছে সেটা মূখ্য বিষয় নয়, তিনি তুলনা টানলেন পছন্দের দেশের পছন্দের ঘটনার। ঝরে যাওয়া কিছু শিশু প্রাণের বিনিময়ে এধরণের দায়িত্বহীন আচরণ ছাত্ররা মেনে নিতে পারেনি। তাই অন্য দুর্ঘটনার চেয়ে এটা অন্য মাত্রা পেয়েছে। সমর্থন পেয়েছে সাধারণ জনগণের।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এআরআই-এর হিসেবে গত দশ বছরে বাংলাদেশে ২৯ হাজার ৪৩২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ২৬ হাজার ৬৮৬ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ২১ হাজার ৫৪৮ জন। এ সংখ্যা অনেক ছোটকাট গৃহযুদ্ধে বছরের গড় আহত ও নিহতের পরিসংখ্যানের চেয়ে কিছু কম হবে না। অথচ এ সমস্যা সমাধানের কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা ইনভেস্টিগেশন করে। কিন্তু দেখা যায় তদন্তের সুপারিশগুলোর কোন বাস্তবায়ন হয় না। ফলে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই রয়ে গেছে। পথচারীর সচেতনতা ছাড়া যেসব কারণগুলো দেখা যায় তার প্রায় সবগুলোই সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর গাফিলতি। দেশের রাস্তাগুলো এখনো জনবান্ধব করা যায়নি, ফিটনেসবিহীন গাড়ী, লাইসেন্সবিহীন চালক, পুলিশ, বিআরটিএ, সড়ক বিভাগ ইত্যাদির মাত্রাতিরিক্ত দূর্নীতি ইত্যাদি আমাদের আজ এ জায়গায় নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছে। আশ্চর্য করার মতো তথ্য হলোঃ সওজের (সড়ক ও জনপথ অধিদফতর) অধীনে সারা দেশে ১৯ হাজার ৩৮৭ কিলোমিটার পাকা সড়ক- মহাসড়ক রয়েছে যার মধ্যে ৩ হাজার ৯০৫ কিলোমিটার বা ২৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ সড়ক-মহাসড়ক মোটামুটি চলনসই। কেউ কেউ এ সড়কগুলোকে মরণ ফাঁদ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

“বুয়েটের থেকে বলা হয়েছে ঢাকা আরিচা রোড অগ্রহণযোগ্য, গাড়ি চলার উপযুক্ত না, বাঁকগুলি ডেঞ্জারাস। তাহলে রাস্তাগুলো কেন সংস্কার করা হলো না। না করার কারণেই তো মিশুক মুনীর সেখানে দুর্ঘটনার শিকার হলো!” এটা বলেছেন এআরআই-এর প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক। এটা একটা উদাহরণ মাত্র। বাংলাদেশের বেশিরভাগ সড়কই অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ও বিপদজনক। ঢাকায় রাস্তার ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি গাড়ী নিবন্ধন দেয়া হয়েছে এবং এখনো দেয়া হচ্ছে। যার জন্য সড়কে সড়ক বিধির আওতায় সব যানবাহনকে নিয়ে আসা যাচ্ছে না। মানে রাস্তার শৃংখলা ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বহু আগে। যার পরিণাম ভোগ করছে দেশের সাধারণ মানুষ। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলেছে– রাজধানী ঢাকায় ৮০ হাজারের বেশি যানবাহন চলছে ফিটনেস (চলাচলের উপযোগী সনদ) ছাড়া। এরা কিভাবে গাড়ী চালাচ্ছে? নিশ্চয় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারীদের সহযোগিতায়।

আমাদের সরকার এসব নিয়ন্ত্রণে সক্ষম নয় এটা বললে আমি মানতে পারব না। কারণ, সরকার ইতোমধ্যে পুলিশ দিয়ে যে যে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে যার জন্য সরকার বিরুধীরা হয় জেলে নয় তো ঘরে বন্ধী। এই পুলিশই একাধিক বার ক্ষমতায় থাকা একটি দলকে রাস্তায় উঠতে দিচ্ছে না। আমি মনে করি সে সরকার চাইলে– ফিটনেসবিহীন একটি গাড়ীও রাস্তায় উঠতে না দিতে সক্ষম। এদেশে আমরা অনেক কিছুই দেখেছি। ক্ষমতার অনেক রং, অনেক হিংস্রতাও আমাদের চোখে পড়েছে। এদেশের সরকার পারে না এমন কিছুই নেই যদি তারা চান। কিন্তু তারা চান না জনগণের অধিকার, নিরাপত্তা, হয়রানিহীন একটি জীবন পাক। আজ সরকার বা তারা যে শক্তিটা মানুষের অধিকারের বিরুদ্ধে খরচ করছে বা যে শক্তিটা অপছন্দের দল বা প্রতিবাদিদের বিরুদ্ধে খরচ করছে, সে শক্তিটা যদি একটি একটি করে গণসমস্যাকে চিহ্নিত করে সমাধানের পেছনে খরচ করতো তাহলে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে আমরা অন্য একটি বাংলাদেশ দেখতে পেতাম।

অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ করতে জানি অনেক ব্যয় ও ঝামেলার বিষয়। কিন্তু পরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়াটা অসম্ভব নয়। আমাদের দেশের সড়কের নিমার্ণ ব্যয় পৃথিবীর অন্য দেশের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। দেখা যায়, ইউরোপে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ২৮ কোটি টাকা। পাশের দেশ ভারতে এ ব্যয় ১০ কোটি টাকা। আর চীনে তা গড়ে ১৩ কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশের তিনটি মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ব্যয় হচ্ছে গড়ে ৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক চার লেন নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫ কোটি টাকা। ফলে মহাসড়ক নির্মাণে সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশে পরিণত হওয়ার পথে বাংলাদেশ। এত ব্যয় করা সত্ত্বেও কেন আমরা নিরাপদ সড়ক পাচ্ছি না?

সরকার ইচ্ছে মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে এদেশে। তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনগণ কি বলল না বলল সেদিকে সরকার কোনদিনই মাথা ঘামায়নি। বিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি, স্থান ইত্যাদি নিয়ে দেশের মানুষের আপত্তি ছিল কিন্তু সরকারের বাস্তবায়নে কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। সরকার সেদিকে কানই দেয়নি। সড়ক নির্মাণে সরকার এখন যে ব্যয় করছে, যদি উপযুক্ত সড়ক নির্মাণে ব্যয় আরো বৃদ্ধি পায় তাহলে আমার মনে হয় জনগণ মেনে নেবে। আর না মানলেও তাতে কি হয়েছে? আপনারা কি জনগণের কথার কোন তোয়াক্কা করেন? কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে আর কত প্রাণের বিনিময়ে আপনারা গণসমস্যাগুলো নিয়ে একটু দায়িত্বশীল হবেন? দেশের মন্ত্রীরা একটু দায়িত্বশীল আচরণ দেখাবেন?

ক্ষুদে ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন করছে। এ আন্দোলনের সমালোচনাও করছেন অনেকেই। আমার মনে হয়েছে এসব হলো আন্দোলনের গোড়ায় পানি ঢালার চেষ্টা যেন নিভে যাওয়ার পক্ষে সহায়ক হয়। অশ্লীল কয়েকটি প্লেকার্ড হাতে নিয়ে শিশুরা প্রতিবাদ করেছে। আমার চোখে এরকম কয়েকটি প্লেকার্ড পড়েছে। হয়ত আরো থাকতে পারে। অকালে ঝরে যাওয়া কিছু প্রাণের উপর প্রস্ফুটিত হওয়া একটি আন্দোলনকে অযুক্তিক বলার জন্য কয়েকটি অশ্লীল প্লেকার্ড কি যথেষ্ট? প্রতিবাদে কোন ভুল থাকবে না তা হতে পারে না। আসল কথা হলো যে উদ্দেশ্য আজকের প্রতিবাদ সেটা ন্যায্য কিনা। ন্যায্যতা ফিরিয়ে দেয়া হলে আরো একটি অশ্লীলতা বা অন্যায়ের জন্ম হবে না। এটা সব সরকারেরই কৌশল। প্রতিবাদীদের কথা প্রথম দিকে কানে নেয়া হবে না। মন্ত্রীরা হাসি তামাশা করে প্রতিবাদীদের উস্কে দেবে যেন দমন পিড়নের কিছু সূত্র পাওয়া যায়– যেন সূত্রগুলোকে আড় হিসেবে ব্যবহার করে আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। এতে পুলিশ লেলিয়ে দেয়া যায় সহজে। কয়েকদিন পর দেখবেন এটাকে রাজনৈতিক আন্দোলন বলে চালানোর জন্য অন্য কোন নতুন সূত্র সরকার আবিষ্কার করে ফেলবে। তখন কেল্লাফতে হয়ে যাবে অধিকার আদায়ের একটি সম্ভাবনাময় আন্দোলনের।

পৃথিবীর অনেক ঐতিহাসিক আন্দোলনেরও কিছু ভুল ছিল। শিশুদের আন্দোলনে ভুল আরো বেশি থাকবে এটা আশা করা যায়। অশ্লীল প্লেকার্ডগুলো শিশুদের অতি উৎসাহী, আবেগ ও ঘৃণার প্রতিফলন হতে পারে যা আন্দোলনের ভেতরে স্থান করে নিয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। আমরাও জানি এটা কাম্য নয় কিন্তু একটি বিশেষ দৃষ্টিকোন থেকে এটাকে সহনশীলতার চোখে দেখতে চেষ্টা করছি বৈকি। কিন্তু এদেশের মানুষ কি ভুলে গেছে– দেশের জাতীয় ও পবিত্র সংসদে কিভাবে অশ্লীল ইংগিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেছে এদেশের সাংসদরা? একসিডেন্ট হওয়া কোন মানুষের আপত্তিকর অংগ দেখা গেলে আমরা সেটা নিয়ে কথা বলি না। বলি না– ওর অশ্লীল অবস্থা। কারণ আমাদের তখন মূখ্য বিষয় থাকে তার পরিস্থিতি ও অবস্থার উপর যেখানে সে ক্ষতিগ্রস্ত। আসলে ওটা অশ্লীলতার সমালোচনা করার সময় নয়। এবারের আন্দোলন খুবই অবুঝ কিছু ছাত্রছাত্রী গড়ে তুলেছে। আমি যেমন অশ্লীলতা কামনা করি না তেমনি এর জন্য যে উদ্দেশ্যে আন্দোলন তার উপর থেকে সমর্থন তুলে নিতে পারব না। আসলে প্রতিবাদের ভাষা কি রকম হবে তা আগে থেকে বলে দেয়া খুবই মুশকিল। আমরা জানি না প্রতিবাদের ভাষার রূপক প্রকাশ কি রকম হবে। দায়িত্বশীলদের উচিত এ ইস্যু দ্রুত সমাধান করা যাতে ক্ষুদে ছাত্রছাত্রীদের আরো কলক্ঙিত করতে না পারে বা কলক্ঙিত হবার সুযোগ তৈরী না হয়।

আন্দোলনের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণও করছে। গাড়ীর কাগজপত্র দেখছে। এতে কিছু হাস্যকর বা আশ্চর্যজনক বিষয় আবিস্কার হয়েছে। পুলিশেরই কিনা লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে না। মন্ত্রী চলছে ওল্টো পথে। একটি অনলাইন পত্রিকায় দেখলাম, “আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেননি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও। আইন সবার জন্য সমান-এমনটি তুলে ধরতে বৃহস্পতিবার (২ আগস্ট) রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা, বিচারক, সচিব, আমলা, পুলিশের ডিআইজি, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ও চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করেন। কাগজপত্র না থাকায় অনেকের গাড়ি আটকে দেয়া হয়। তাদের কেউ কেউ দুঃখ প্রকাশ করে ছাড়া পান। কারও কারও বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।” ভাবুন এবার, সর্ষের ভেতরেই কিভাবে ভুত লুকিয়ে আছে। যে ডাক্তার রোগ ছাড়াবেন তিনিই কিনা বিছানায় কাত হয়ে পড়ে আছে। নাহ, ওনারা লজ্জিত হবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন!

এদেশে ক্ষমতার আধিপত্য দিয়ে সব কিছু হালাল করে নেয়া হয়। আইন কেবল ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষের উপরই প্রয়োগ হয়। শুধু প্রয়োগ নয়, ক্ষমতাশালীদের ইচ্ছে হলেই যে কোন সাধারণ মানুষকে আইনের ঘেরাকলে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ফাঁসিয়ে দিতে পারে। আমাদের মন্ত্রীরা ঘুষ গ্রহণকে উপহার গ্রহণের সাথে তুলনা করেন। পুরো অস্থির ও দূর্নীতির গহ্বরে ডুবে থাকা একটি দেশের সামনে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ভাব দেখান যেন দেশে কিছুই হয়নি। আপনারা এত ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছেন যে– পরের ঘরে সন্তানদের মৃত্যু, পুলিশের লাঠিপেটা ইত্যাদি আপনাদের বিচলিত করতে পারে না। আপনারা ক্ষমতার ওজনে এতই নিচে নেমে গেছেন যে– সাধারণ মানুষের হাহাকার আপনাদের হীনতা পর্যন্ত পৌঁছে না। ক্ষমতা আপনাদের এতটা বেষ্টিত করে ফেলেছে যে– নাগরিক অধিকার হারিয়ের যাবার ভাষ্য সে বেষ্টনী ভেদ করতে পারে না। না, ভুল কারোরই না– ভুল হলো সাধারণ মানুষের যারা দেশটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সাধারণ মানুষ জানে না, অবুঝ শিশুরা জানে না এদেশে স্বপ্ন দেখা একটি নিষিদ্ধ অপরাধ!

সূত্রঃ
https://www.bbc.com/bengali/news-39140634
http://archive.prothom-alo.com/deta…/…/2010-06-04/news/68416
http://www.kichuboltechai.com/2017/08/23/

আহমদ শরীফ

আহমদ শরীফ একাধারে একজন শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ, লেখক, বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভূত বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতি পরিমণ্ডলের অন্যতম প্রতিভূ এবং মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গবেষক। তিনি ১৯২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি  চট্টগ্রাম জেলার  পটিয়া উপজেলার সুচক্রদন্ডী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবদুল আজিজ ছিলেন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজিয়েট স্কুলের করণিক এবং মায়ের নাম মিরাজ খাতুন।

এ মুসলিম পরিবারের অন্দর মহলে শিক্ষার আলো ঢুকিয়েছিল উনিশ শতকেই। তাঁর ষষ্ঠ পূর্ব্বপুরুষ কাদের রজা সন্তানের জন্য কাজী দৌলতের সতী ময়না লোরচন্দ্রানী পুঁথিটি নিজ হাতে নকল করেছিলেন। চট্টগ্রামের মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এন্ট্রাস পাস করা এবং বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি বলে খ্যাত আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন তাঁর কাকা ও পিতৃপ্রতিম। জন্মের পর হতে আহমদ শরীফ সাহিত্যবিশারদ ও তাঁর স্ত্রীর কাছে পুত্র স্নেহে লালিত-পালিত হয়েছেন। ফলত অনেকের কাছেই তিনি সাহিত্য বিশারদের সন্তান হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তাঁদের পিতা-পুত্রের এ সম্পর্ক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল। ১৯৪৭ সালের ৭ নভেম্বর সালেহা মাহমুদের সঙ্গে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। ২৪শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ তারিখে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়।

আহমদ শরীফের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ হয় পটিয়া হাই স্কুল,  চট্টগ্রাম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৪৪ সালে বাংলায় এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে দুশ পঞ্চাশ টাকার বেতনে গ্রিভেন্সিভ অফিসার হিসেবে দুর্নীতি দমন বিভাগে চাকরি দিয়ে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেন। কিন্তু নীতিগত কারণে সেই চাকরি বেশিদিন করেননি। আসলে তার রক্তের শিরায় প্রবাহিত ছিল শিক্ষকতার নেশা। ফলে লাকসাম পশ্চিমগাঁও নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে বাংলার অধ্যাপকরূপে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। এক বছরের বেশি সময় রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে অণুষ্ঠান সহকারী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৮ সালে ডিসেম্বর হতে ১৯৪৯ সালের জুন পর্যন্ত ফেনী ডিগ্রি কলেজে অধ্যাপনায় কাটে আরো কিছুদিন।

এরপর ১৯৫০ সালের ১৮ ডিসেম্বর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগদান করলেও পরে তিনি এ বিভাগের একজন শিক্ষক হন। চাকরির শর্ত ছিল এই যে, তিনি আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের বিশাল পুঁথির সম্ভার বিনা অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়ে দিবেন এবং তার বিনিময়ে ঐ পুঁথি দেখভালের জন্য তাঁকে নিয়োগ করা হবে। এই শর্তের সূত্রেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার ছাড়পত্র লাভ করেন। মধ্যযুগের কবি সৈয়দ সুলতানের ওপর গবেষণা করে তিনি ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৭২ সালে প্রফেসর পদে উন্নীত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকালের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান, কলা অনুষদের ডীন, সিন্ডিকেট সদস্য এবং শিক্ষক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তরকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৬ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অন্যতম রূপকারও ছিলেন তিনি। সুদীর্ঘ তেত্রিশ বছর অধ্যাপনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ সালের ৩০ জুন অবসর গ্রহণ করেন। পরে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দুবছরের (১৯৮৪-৮৬) জন্য নজরুল অধ্যাপক পদে সমাসীন ছিলেন।

আহমদ শরীফ বড় হয়ে উঠেছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের দুর্লভ অমূল্য পুঁথির ভাণ্ডার ও সাময়িক পত্রপত্রিকার সম্ভারের মধ্যে। তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি ব্যয় করেছেন মধ্যযুগের সাহিত্য ও সামাজিক ইতিহাস রচনার জন্য। যা ইতিহাসের অন্যতম দলিল। বিশ্লেষণাত্মক তথ্য, তত্ত্ব ও যুক্তিসমৃদ্ধ দীর্ঘ ভূমিকার মাধ্যমে তিনি মধ্যযুগের সমাজে ও সংস্কৃতির ইতিহাস বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে দিয়ে গেছেন যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অমর গাঁথা হয়ে থাকবে।

অধ্যাপক শরীফের চাচা আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ছয়শ পুথি দান করেন। সেগুলি অবলম্বন করেই আহমদ শরীফের গবেষণা-জীবনের সূচনা হয় এবং অচিরেই তিনি পুথিপাঠে পারদর্শিতা অর্জন করেন। সে থেকে আজীবন তিনি পুথি নিয়ে ভেবেছেন এবং বহু উল্লেখযোগ্য পুথি সম্পাদনাও করেছেন। বাংলা একাডেমীর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ তাঁরই সম্পাদিত ষোল শতকের কবি দৌলত উজির বাহরাম খাঁর  লায়লী-মজনু (১৯৫৭)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগেরও প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ তাঁর সম্পাদিত পুথি পরিচিতি (১৯৫৮)। এতে সাহিত্যবিশারদ প্রদত্ত ছয়শ পুথির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি আছে। অধ্যাপক শরীফ মধ্যযুগের চল্লিশোর্ধ্ব কাব্যের পুথি সম্পাদনা করেছেন। সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: আলাওলের তোহফা (১৯৫৮) ও সিকান্দরনামা (১৯৭৭), মুহম্মদ খানের সত্য-কলি-বিবাদ-সংবাদ (১৯৫৯), মুসলিম কবির পদসাহিত্য (১৯৬১), জয়েনউদ্দীনের  রসুলবিজয় (১৯৬৪), মুজাম্মিলের নীতিশাস্ত্রবার্তা (১৯৬৫), মধ্যযুগের রাগতালনামা (১৯৬৭), বাঙলার সূফীসাহিত্য (১৯৬৯), আফজল আলীর নসিহতনামা (১৯৬৯), বাউলতত্ত্ব (১৯৭৩), সৈয়দ সুলতানের  নবীবংশ,  রসুলচরিত (১৯৭৮) ইত্যাদি।

তিনি তাঁর গবেষণা ও ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানদের অবদানের যথার্থ পরিচয় তুলে ধরেন। তিনি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল বাঙালির সাধনাকেই অসাম্প্রদায়িক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করেছেন, যা তাঁকে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনন্যতা এনে দিয়েছে। তাঁর বাঙালী ও বাঙলা সাহিত্য (দুখন্ড ১৯৭৮, ১৯৮৩) মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করেছে। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা। মধ্যযুগের সাহিত্য বিষয়ে তাঁর আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সৈয়দ সুলতান: তাঁর গ্রন্থাবলী ও তাঁর যুগ (১৯৭২), মধ্যযুগের সাহিত্যে সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ (১৯৭৭) ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য (১৯৮৫)।

অধ্যাপক শরীফ একদিকে যেমন ছিলেন  বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্বনামধন্য শিক্ষক ও গবেষক, অন্যদিকে ছিলেন দেশের অন্যতম বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ। লেখার জগতে তাঁর পদার্পণ ঘটে চল্লিশের দশকে। সে থেকে আমৃত্যুই তিনি লিখেছেন। তাঁর লেখার প্রধান বিষয় ছিল বাংলাদেশ, বাঙালি সমাজ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। বাংলাদেশ ও বাঙালি সত্তার স্বরূপ সন্ধানে তাঁর লেখাগুলি অত্যন্ত মূল্যবান। তিনি দেশ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, দর্শন, নৃতত্ত্ব, ধর্ম, ভাষা, রাজনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে প্রচুর লিখেছেন। তিনি সমাজ-প্রগতির একজন পর্যবেক্ষকও ছিলেন। প্রতিদিনের বৈশ্বিক ও দৈশিক ঘটনাবলি তাঁর লেখকসত্তাকে নিয়ত আলোড়িত করত এবং তিনিও সেভাবে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন, বিশেষ করে বাংলাদেশের চলমান জীবন সম্পর্কে। এসব নিয়ে তিনি শেষ জীবনে দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। হয়তো তাঁর কোনো কোনো লেখা বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, কিন্তু তাঁর সব লেখাই চিন্তা ও প্রশ্ন উদ্রেককারী।

অধ্যাপক শরীফ ছিলেন একজন যুক্তিনিষ্ঠ, বিজ্ঞানমনস্ক, মানবকল্যাণকামী, শ্রেয়োবাদী ও প্রগতিশীল লেখক। বাংলাদেশের সমাজ, সাহিত্য, রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন ইত্যাদি সম্পর্কে তিনি বিভিন্ন সময়ে যে প্রবন্ধগুলি রচনা করেছেন তার সংকলন গ্রন্থের সংখ্যা চল্লিশোর্ধ্ব। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: বিচিত চিন্তা (১৯৬৮), সাহিত্য ও সংস্কৃতি চিন্তা (১৯৬৯), স্বদেশ অন্বেষা (১৯৭০), জীবনে সমাজে সাহিত্যে (১৯৭০), প্রত্যয় ও প্রত্যাশা (১৯৭১), যুগ যন্ত্রণা (১৯৭৪), কালের দর্পণে স্বদেশ (১৯৮৫), বাঙালীর চিন্তা-চেতনার বিবর্তন ধারা (১৯৮৭), বাঙলার বিপ্লবী পটভূমি (১৯৮৯), বাঙলাদেশের সাম্প্রতিক চালচিত্র (১৯৯০), মানবতা ও গণমুক্তি (১৯৯০), বাঙলা, বাঙালী ও বাঙালীত্ব (১৯৯২), প্রগতির বাধা ও পন্থা (১৯৯৪), এ শতকে আমাদের জীবনধারার রূপরেখা (১৯৯৪), স্বদেশ চিন্তা (১৯৯৭), জিজ্ঞাসা ও অন্বেষা (১৯৯৭), বিশ শতকে বাঙালী (১৯৯৮), বিশ্বাসবাদ, বিজ্ঞানবাদ, যুক্তিবাদ, মৌলবাদ (২০০০) ইত্যাদি। গবেষণা, প্রবন্ধ ও চিন্তামূলক রচনার জন্য তিনি বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, দাউদ সাহিত্য পুরস্কার, রাষ্ট্রীয় একুশে পদক এবং কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি লাভ করেন।

ভাববাদ, মানবতাবাদ ও মাকর্সবাদের যৌগিক সমন্বয় প্রতিফলিত হয়েছিল তাঁর চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, আচার-আচরণে এবং বক্তব্য ও লেখনীতে। তাঁর রচিত একশত এর অধিক গ্রন্থের প্রবন্ধসমূহে তিনি অত্যন্ত জোরালো যুক্তি দিয়ে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা, বিশ্বাস ও সংস্কার পরিত্যাগ করেছিলেন এবং আন্তরিকভাবে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের বিষয়ে আশাবাদী ছিলেন। পঞ্চাশ দশক হতে নব্বই দশকের শেষাবধি সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, দর্শন ও ইতিহাসসহ প্রায় সব বিষয়ে তিনি অজস্র প্রবন্ধ লিখেছেন। দ্রোহী সমাজ পরিবর্তনকারীদের কাছে আজো তার পুস্তকরাশির জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। তাঁর বিশাল পুস্তকরাশির মধ্যে যেমন মানুষের আর্থসামাজিক রাজনৈতিক মুক্তির কথা রয়েছে তেমনি তৎকালীন পাকিস্তানের বেড়াজাল হতে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতা তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে গঠিত ‘নিউক্লিয়াস’ (স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ)-এর সঙ্গে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১৯৬৫ সালে তাঁর লেখা ‘ইতিহাসের ধারায় বাঙালি’ প্রবন্ধে পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ এবং ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটির কথা উল্লেখ ছিল। এছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব সময় হতে তাঁর মৃত্যু অবধি তিনি দেশের সকল ক্রান্তিলগ্নে কখনো এককভাবে, কখনো সম্মিলিতভাবে তা প্রশমনের জন্য মুক্ত মনে এগিয়ে এসেছিলেন। উপমহাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে অসামান্য পণ্ডিত, বিদ্রোহী, অসাম্প্রদায়িক যুক্তিবাদী, দার্শনিক, বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব, প্রগতিশীল, মানবতাবাদী, মুক্তবুদ্ধির ও নির্মোহ চিন্তার এক অনন্য ধারক ছিলেন ড. আহমদ শরীফ।

তিনি জন্মসূত্রে মুসলমান হলেও স্বঘোষিত নাস্তিক। স্বঘোষিত নাস্তিক হওয়ার কারণে অনেকে তাকে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী ঘোষণা করেন। ধর্মীয় কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সক্রিয় ছিলেন। ১৯৯৫ সালে একটি উইলের মাধ্যমে তার মরণোত্তর চক্ষু ও দেহদান করার কথা লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। সে উইলে লেখা ছিল, ‘চক্ষু শ্রেষ্ঠ প্রত্যঙ্গ, আর রক্ত হচ্ছে প্রাণ প্রতীক, কাজেই গোটা অঙ্গ কবরের কীটের খাদ্য হওয়ার চেয়ে মানুষের কাজে লাগাইতো বাঞ্ছনীয়’। তাঁর উইল অনুযায়ী মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের জন্য দান করে দেয়া হয়।

একজন নিঃস্বার্থ ও নির্ভীক বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি সমাজের অনেক গুরুদায়িত্ব পালন করেন। অন্যায় ও গণবিরোধী কাজের জন্য তিনি যে-কোনো সরকারেরই তীব্র সমালোচনা করতেন। দেশী-বিদেশী নানা ষড়যন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদী অপকর্মের তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, সেনাশাসন, স্বৈরাচার এবং স্বাধীনতার শত্রুদের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে তিনি সবসময় কঠোর ভাষায় কলম চালিয়েছেন এবং বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন। এজন্য তিনি সরকার ও ধর্মান্ধদের রোষানলে পড়েন। তাঁর লিখনে ও ভাষণে প্রতিক্রিয়াশীলরা ক্ষুব্ধ হতেন, কিন্তু প্রগতিশীল ও সমাজতন্ত্রীরা অনুপ্রাণিত হতেন। চিন্তা-চেতনায় অধ্যাপক শরীফ ছিলেন শ্রেয়োবাদী ও বামঘেঁষা। তিনি ছিলেন সামাজিক উপযোগিতাবাদী লেখক। আজীবন তিনি মানবতাবাদী, দেশহিতৈষী ও প্রগতিপন্থি বিভিন্ন সংঘ, সমিতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১-এর মার্চে পাকিস্তানি অপশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে উজ্জীবিত হওয়ার জন্য তিনি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পূর্ব বাংলার লেখকদের শপথ বাক্য পাঠ করান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তিনি যেসব সভা-সমিতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তি ছিলেন সেগুলির মধ্যে কয়েকটি হলো: মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও আইন সাহায্য কমিটি,  বাংলাদেশ লেখক শিবির, বাংলাদেশ ভাষা সমিতি, কর্নেল তাহের সংসদ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফ্রন্ট, স্বদেশ চিন্তা সংঘ ইত্যাদি।

আহমদ শরীফ ছিলেন একটি সফল কর্মময় জীবনের অধিকারী। তাঁর গবেষণাব্রত, লেখার জ্ঞানগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং তাঁর দেশহিতৈষিণী চিন্তা তাঁকে আমৃত্যু সক্রিয় রেখেছিল। ১৯৯৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি জীবনাবসান ঘটে এই মনিষীর। এই বিশিষ্ট বাঙ্গালি ব্যক্তিত্বের স্মরণে ড. আহমদ শরীফ স্মৃতি পুরস্কার  প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রতি বছরই এ পুরস্কার প্রদান করা হয়।

তথ্যসূত্রঃ

১। উইকিপিডিয়া।

২। বাংলাপিডিয়া।

লুন্ঠিত শুভ্রতা

এখনো কাটা তারে ঝুলে থাকে ফেলানীর লাশ
এখানে ওখানে পড়ে থাকে টুকরো টুকরো দেহ
মন্দিরের ঈশ্বর সাক্ষি হলেন– কিভাবে ব্যবচ্ছেদ
হতে হতে মরে গেল আসিফা; জানলো না কেহ।

একটা তীব্র অভিমান শিশুটির গলায় আটকে থাকে
ক্ষণজনমের এই বিভৎস বিধায়ে কি সুখ পেলেন বিধাতা!
ঘৃণ্য অনুপ্রবেশের যন্ত্রণায় চিৎকার যেন না হয়
কন্ঠনালী ছিঁড়ে দিয়েছে পশুদলের নিপুন বর্বরতা।

কেউ জানবে না তখনো, কেবল ঈশ্বর ছাড়া; অতঃপর;
সর্বনাশের পর্ব শেষ হলে আওয়াজ ওঠবে পত্রিকায়
কিছু স্লোগান, কিছু মিছিল, কিছু রসাত্বক বিশ্লেষণ
সবি জমা হবে কোন মানবতাবাদীর হিসেবের খাতায়।

ভিঞ্চির তুলি যারে বানিয়েছে মোনালিসা
সে রমনীয় ভুবন ভোলানো হাসি এখন গেল কোথা?
বৃন্তচ্যুৎ ফুলের মতো ঘাসে ঘাসে শিশু রক্তছাপ
লুন্ঠিত তব কোমল নেত্রজুড়ে থাকা চির শুভ্রতা।